ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, পাহাড়-সমতল, জাতি-গোষ্ঠী কিংবা ধর্মীয় পরিচয় কোনোভাবেই আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে না। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক, আমাদের জাতীয় পরিচয় বাংলাদেশি। সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করে সাম্য, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রত্যেক ধর্মই সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানবকল্যাণের শিক্ষা দেয়। তাই প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথভাবে পালন করলে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় হবে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত ‘ঢাকা ওয়ানগালা-২০২৬’ উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ
ডেপুটি স্পীকার বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর ও আনন্দঘন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার, আইনি অধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ প্রকৃত অর্থে ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণে কালচারাল একাডেমির ভূমিকা
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করতে তিনি ১০টি কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মধ্যে নেত্রকোনার দুর্গাপুরেও একটি কালচারাল একাডেমি রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা সংরক্ষণে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকার কালচারাল একাডেমিগুলোর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী।
ঢাকা ওয়ানগালা-২০২৬-এর আয়োজকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ডেপুটি স্পীকার বনানী এলাকায় একটি কালচারাল একাডেমি এবং একটি গির্জা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শিগগিরই গ্রহণের আশ্বাস দেন।
বড়দিন উদযাপনে ৩ কোটি টাকা অনুদানের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
আসন্ন বড়দিন-২০২৬ উদযাপন প্রসঙ্গে ডেপুটি স্পীকার জানান, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা উৎসব উদযাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ২ কোটি টাকা অনুদানের আবেদন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আবেদনের চেয়েও ১ কোটি টাকা বেশি, অর্থাৎ ৩ কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একজন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে, যিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকবেন এবং প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন।
সকলের অংশগ্রহণে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয়ে আমরা একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ পেয়েছি। অতীতের বিভেদ ভুলে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে প্রত্যেক মানুষের মানবিক মর্যাদা থাকবে, সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে।
গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় ও কার্যকর করতে তিনি দল, মত, শ্রেণি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি
উল্লেখ্য, ওয়ানগালা উদযাপন কমিটি-২০২৬ এ উৎসবের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা ওয়ানগালা-২০২৬-এর নকমা জন দ্রং।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ঢাকা ওয়ানগালার সাবেক নকমা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক দীপঙ্কর রিছিল।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত, বাংলাদেশে ইউনেস্কোর আবাসিক প্রতিনিধি ড. সুজান ভাইজ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আন্দ্রিয় দ্রং, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির প্রিন্সিপাল অ্যাডভাইজার প্রফেসর ডা. মো. আনোয়ারুল কবির, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রেজাউর রহমান ফাহিম, বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান, ঢাকা কর অঞ্চল-৩-এর যুগ্ম কর কমিশনার কর্ণেলিউস কামা, নয়ানগর ক্রিশ্চিয়ান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের সভাপতি রিপন রিচার্ড সরদার, দি ক্রিশ্চিয়ান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড, ঢাকার প্রেসিডেন্ট মাইকেল গোমেজ এবং গুড নেইবারস বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড বার্টিন গোমেজ।
মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে ডেপুটি স্পীকার ঢাকা ওয়ানগালা-২০২৬-এর বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। আলোচনা পর্ব শেষে পরিবেশিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
উৎসবে গারো সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী অংশগ্রহণ করেন।