ঢাকা, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রি.
রাজধানীর বনানী থানা এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে বনানী থানা পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- ১। বাসচালক সোহেল রানা (৪১) ২। সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) ৩। হেলপার মোঃ মনির হোসেন (১৯)।
বনানী থানা সূত্রে জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ০৮:৪৫ ঘটিকায় বনানী থানাধীন এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় এক পুরুষের মৃতদেহ পড়ে থাকার সংবাদ পাওয়া যায়। সংবাদ পেয়ে বনানী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃতদেহটি উদ্ধার করে। মৃতের মুখ ও দুই হাতে স্কচটেপ পেঁচানো ছিল এবং গলায় কালো দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে।
মৃতের ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নিহতের নাম ইসমাইল হোসেন (৪৯)। পরে পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে মৃতদেহের ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্তে জানা যায়, ইসমাইল হোসেন জামালপুরের নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রি করে প্রায় ৫ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। তার ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পান।
ঘটনার পর বনানী থানা পুলিশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা শুরু করে। ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি যাত্রীবাহী বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে বাসটি শনাক্ত করা হয়। পরে জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ।
অভিযানকালে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন ও হেলপার মোঃ মনির হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে পৃথক অভিযান পরিচালনা করে চালক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের দিকপাইত বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইলকে যাত্রী হিসেবে বাসে তোলা হয়। পরে বাসের বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ওঠানামা করতে থাকে। একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন ভিকটিমের কাছে ভাড়া চাইলে ইসমাইল লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে ভাড়া পরিশোধ করেন। এ সময় সুপারভাইজার ধারণা করেন, তার কাছে আরও টাকা রয়েছে। বিষয়টি বাসচালক সোহেল রানাকে জানালে সেও ইসমাইলের কাছে আরও টাকা থাকার কথা বলে। এরপর তারা ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে না নামিয়ে বাসের অন্যান্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাসের সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং তার নাক-মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেয়। এরপর গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।
পরবর্তীতে মরদেহ বাসে করে ঢাকায় নিয়ে আসে তারা। বিমানবন্দর এলাকা দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে বনানীতে নেমে কাকলী মোড় হয়ে পুনরায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠে। পরে কাকলী থেকে কুড়িলগামী অংশে ১৭৯ ও ১৮০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে ইসমাইলের মরদেহ ফেলে রেখে বাসটি কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে মহাখালী বাস টার্মিনালে চলে যায়।
এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের বাস, দুটি গামছা, বাসের রক্তমাখা দুটি সিট কভার এবং একটি ফিচার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত সাজু ওরফে লিমনের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি মামলা এবং সোহেলের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি মামলা, দুটি মাদক মামলা ও দুইটি গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।
এই সংক্রান্তে বনানী থানায় হত্যা মামলা রুজু হয়েছে।