আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আনুপাতিক নির্বাচন (Proportional Representation) একটি আলোচিত ও জনপ্রিয় নির্বাচন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীরা তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে জাতীয় সংসদ বা অন্য কোনো প্রতিনিধি পরিষদে আসন পান। বহু দলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য, কারণ এতে ভোটারদের মতামত তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়।
বৈশিষ্ট্য ও ধরণ
এই ব্যবস্থার অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য হলো— ভোটের সঠিক প্রতিনিধিত্ব। একটি দল যদি ১০% ভোট পায়, তাহলে তাদের সংসদেও ১০% আসন পাওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে ছোট দলগুলোর জন্যও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দরজা খুলে যায়, যা একক-প্রার্থীভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থায় সম্ভব হয় না।
আনুপাতিক ব্যবস্থার প্রধান দুটি রূপ হলো:
1. পার্টি লিস্ট সিস্টেম: ভোটাররা ব্যক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক দলের প্রতীকে ভোট দেন। প্রতিটি দল প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে নিজেদের তালিকা থেকে প্রার্থীদের সংসদে পাঠায়।
2. সিঙ্গেল ট্রান্সফারেবল ভোট (STV): ভোটাররা পছন্দক্রমে একাধিক প্রার্থীকে র্যাংক করে ভোট দেন। প্রয়োজনীয় কোটার বেশি ভোট পেলে অতিরিক্ত ভোট অন্যদের মধ্যে স্থানান্তর হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে রাজনীতিতে এলিট শ্রেণীর প্রাধান্য সবসময়ই ছিল। ব্যক্তি-ভিত্তিক জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আনুপাতিক পদ্ধতিতে এই স্থানীয় জনপ্রিয় নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারেন। কারণ এখানে রাজনৈতিক দল তার পছন্দমতো প্রতিনিধি নির্বাচনে অধিক ক্ষমতা পায়। এতে রাজনীতি আরও বেশি কেন্দ্রীভূত ও বাণিজ্যিক হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়। এখানে গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একচেটিয়া ভূমিকা সুস্পষ্ট, এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়া অনেকাংশেই আর্থিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে কিছু জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বড় দলগুলোর মধ্যে নমিনেশন বাণিজ্য যেমন চলে, তেমনি এই পদ্ধতিতে দলের ভেতরে আসন ভাগাভাগি নিয়েও বিবাদ ও বিভাজন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাই বারবার মনোনীত হবেন, আর তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বঞ্চিত থাকবেন। ফলে দলের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা, বঞ্চনা ও কোন্দল জন্ম নিতে পারে।
নেতৃত্বে অভিজাতদের আধিপত্য আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থা লাভ করা প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আনুপাতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলই নির্ধারণ করবে কে সংসদে যাবে, ফলে এখানে মনোনয়ন বাণিজ্য আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। এতে করে তৃণমূলের মেধাবী ও জনপ্রিয় নেতাদের উপেক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। রাজধানী ও কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে, ঢাকা কেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে এমনিতেই অন্যান্য অঞ্চলের নেতারা অনেক সময় উপেক্ষিত থাকেন। আনুপাতিক পদ্ধতিতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই নির্ধারণ করবে কে হবেন সংসদ সদস্য। ফলে ঢাকা বা বড় শহরভিত্তিক নেতারাই বারবার মনোনীত হবেন, যা অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে। দলীয় কোন্দল ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে, যদি কোনো দল ৫টি আসন পায়, তাহলে কারা সেই আসনে যাবেন তা নিয়ে দলে দলে বিভাজন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতার লোভ ও স্বার্থান্বেষী রাজনীতির কারণে অনেকে মনোনয়ন না পেয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়বেন, যা দলের ভেতর দ্বন্দ্ব, কোন্দল এমনকি ভাঙনের আশঙ্কাও তৈরি করতে পারে। ছোট দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার সংকট তৈরী হবে, ছোট রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যদি একটি ছোট দল নির্বাচনে ২-৩টি আসন পায়, তাহলে প্রায় প্রতি নির্বাচনে দলের শীর্ষ নেতারাই সেই আসনগুলো দখল করবেন। এতে দলের অন্যান্য নেতা বা কর্মীরা দীর্ঘমেয়াদে হতাশায় ভুগবেন এবং গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে। জনগণের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক দুর্বল হবে, বর্তমান সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতিতে একটি এলাকার ভোটাররা তাদের প্রতিনিধি চিহ্নিত করতে পারেন, তাদের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করতে পারেন। কিন্তু আনুপাতিক পদ্ধতিতে ভোটার ও প্রতিনিধি—এই দুটি পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হবে। সাধারণ মানুষ জানতেই পারবেন না যে তারা কাকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠালেন। এতে করে জনগণের অংশগ্রহণ ও দায়বদ্ধতার চেতনা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।
আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক পন্থা। এটি বহুদলীয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে এবং ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের আগে সুস্পষ্ট নীতিমালা, দলীয় গণতন্ত্রের চর্চা ও স্বচ্ছ মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে এই পদ্ধতি রাজনৈতিক বৈষম্য, সংঘাত ও দলীয় কোন্দল আরও বাড়াতে পারে। তাই বাংলাদেশে এই মুহূর্তে আনুপাতিক নির্বাচন আত্মঘাতী হতে পারে। কিংবা দেশকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
— মোঃ হাসান শেখ
“এম.এস.এস” রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
-জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়